ইক্বামতে দ্বীন পথ ও পদ্ধতি

বায়‘আতের অর্থ

ছাহেবে মির‘আত বলেন,

سُمِّيَتِ الْمُعَاهَدَةُ عَلَى الْإِسْلاَمِ بِالْمُبَايَعَةِ تَشْبِيْهًا لِّنَيْلِ الثَّوَابِ فِىْ مُقَابَلَةِ الطَّاعَةِ بِعَقْدِ الْبَيْعِ الَّذِىْ هُوَ مُقَابَلَةُ مَالٍ، كَأَنَّهُ بَاعَ مَا عِنْدَهُ مِنْ صَاحِبِهِ وَأَعْطَاهُ خَالِصَةَ نَفْسِهِ وَطَاعَتِهِ كَمَا فِىْ قَوْلِهِ تَعَالَى : (إِنَّ اللهَ اشْتَرَى مِنَ الْمُؤْمِنِينَ) الآية-

‘ইসলামের উপরে কৃত অঙ্গীকারকে বায়‘আত এজন্য বলা হয়েছে যে, ব্যবসায়িক চুক্তির বিপরীতে যেমন সম্পদ লাভ হয়, অনুরূপভাবে আমীরের নিকটে আনুগত্যের বিপরীতে পুণ্য লাভ হয়। সে যেন আমীরের নিকটে তার খালেছ হৃদয় ও খালেছ আনুগত্য বিক্রয় করে দেয়’। যেমন আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ মুমিনদের জান-মাল খরিদ করে নিয়েছেন জান্নাতের বিনিময়ে...’ (তাওবাহ ১১১)।[1]

‘আক্বাবায়ে ঊলা’-র এই প্রথম বায়‘আতের ধরন ছিল মহিলাদের বায়‘আতের ন্যায় হাতে হাত না রেখে মৌখিকভাবে শপথ গ্রহণের মাধ্যমে।[2]

বায়‘আতে কুবরা :

অতঃপর উক্ত বায়‘আতকারীদের দাবীর প্রেক্ষিতে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) মুছ‘আব বিন ‘উমায়ের নামক একজন তরুণ দাঈকে তাদের সাথে ইয়াছরিবে প্রেরণ করেন। তিনিই ছিলেন ইসলামের ইতিহাসে মদীনায় প্রেরিত প্রথম দাঈ। সেখানে গিয়ে তিনি ও তাঁর মেযবান তরুণ ধর্মীয় নেতা আস‘আদ বিন যুরারাহ বিপুল উৎসাহে ইয়াছরিবের ঘরে ঘরে তাওহীদের দাওয়াত পৌঁছাতে শুরু করেন। যার ফলশ্রুতিতে পরের বছর ১৩ নববী বর্ষের হজ্জ মওসুমে ৬২২ খৃষ্টাব্দের জুন মাসে আইয়ামে তাশরীক্বের মধ্যভাগের এক গভীর রাতে পূর্বোক্ত পাহাড়ী সুড়ঙ্গ পথে ৭৩ জন পুরুষ ও ২ জন মহিলার একটি বিরাট দলের আগমন ঘটে। চাচা আববাস-কে সাথে নিয়ে যিনি তখনও ইসলাম কবুল করেননি, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) তাদের নিকটে গমন করেন ও রাত্রির প্রথম প্রহর শেষে নিঃশব্দ রজনীতে বায়‘আতের পূর্বে চাচা আববাস তাদেরকে এই বায়‘আতের পরকালীন গুরুত্ব এবং দুনিয়াতে সম্ভাব্য কষ্ট-দুঃখের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে সংক্ষিপ্ত বক্তব্য রাখেন। এতে তারা স্বীকৃত হ’লে বিগত দু’বছরে ইসলাম গ্রহণকারীদেরকে পরপর দাঁড় করানো হয়। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) তাদের নিকটে কুরআন তেলাওয়াত অন্তে তাওহীদের দাওয়াত দিয়ে কিছু বক্তব্য রাখেন। তখন তারা সকলে বলেন, আমরা আমাদের জান-মালের ক্ষয়-ক্ষতির বিনিময়ে অত্র অঙ্গীকার করছি। কিন্তু এর বিনিময়ে আমরা কি পাব? রাসূল (ছাঃ) বললেন, ‘জান্নাত’ (اَلْجَنَّةُ)। তখন তারা বললেন, أُبْسُطْ يَدَكَ ‘আপনার হাত বাড়িয়ে দিন’। অতঃপর আস‘আদ বিন যুরারাহ নেতা হিসাবে প্রথম তাঁর হাতে বায়‘আত করেন ও তারপর একে একে সকলে রাসূলের হাতে বায়‘আত করেন।[3] মহিলা দু’জন মুখে বলার মাধ্যমে বায়‘আত করেন। সৌভাগ্যবতী ঐ দু’জন মহিলা ছিলেন বনু মাঝেন গোত্রের নুসাইবাহ বিনতে কা‘ব উম্মে ‘উমারাহ এবং বনু সালামাহ গোত্রের আসমা বিনতে ‘আমর উম্মে মুনী‘। উক্ত বায়‘আতের বক্তব্য ছিল নিম্নরূপ :

قَالَ جَابِرٌ : قُلْنَا يَا رَسُوْلَ اللهِ عَلَى مَا نُبَايِعُكَ؟ قَالَ : عَلَى السَّمْعِ وَالطَّاعَةِ فِى النَّشَاطِ وَالْكَسَلِ وَعَلَى النَّفَقَةِ فِى الْعُسْرِ وَالْيُسْرِ، وَعَلَى الأَمْرِ بِالْمَعْرُوفِ وَالنَّهْىِ عَنِ الْمُنْكَرِ، وَعَلَى أَنْ تَقُوْمُوْا فِي اللهِ لَا تَأْخُذُكُمْ فِيهِ لَوْمَةُ لَائِمٍ، وَعَلَى أَنْ تَنْصُرُوْنِىْ إِذَا قَدِمْتُ اِلَيْكُمْ وَتَمْنَعُونِىْ مِمَّا تَمْنَعُوْنَ مِنْهُ أَنْفُسَكُمْ وَأَزْوَاجَكُمْ وَأَبْنَاءَكُمْ وَلَكُمُ الْجَنَّةُ- رواه احمد بإسناد حسن وصححه الحاكم وابن حبان، وروى ابن إسحاق ما يشبه هذا عن عبادة بن الصامت وفيه بند زائد وهو "وَأَنْ لاَ نُنَازِعَ الْأَمْرَ أَهْلَهُ" كما فى سيرة ابن هشام-

জাবির বিন আবদুল্লাহ (রাঃ) বলেন, ‘হে আল্লাহর রাসূল! আমরা আপনার নিকটে কি বিষয়ে বায়‘আত করব? জবাবে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বললেন, (১) আনন্দে ও  অলসতায় সর্বাবস্থায় আমার কথা শুনবে ও মেনে চলবে (২) কষ্টে ও স্বচ্ছলতায় (আল্লাহর রাস্তায়) খরচ করবে (৩) ভাল কাজের নির্দেশ দিবে ও অন্যায় কাজ থেকে নিষেধ করবে (৪) আল্লাহর পথে সর্বদা দন্ডায়মান থাকবে এবং উক্ত বিষয়ে কোন নিন্দুকের নিন্দাবাদকে পরোয়া করবে না (৫) যখন আমি তোমাদের নিকটে হিজরত করে যাব, তখন তোমরা আমাকে সাহায্য করবে এবং যেভাবে তোমরা তোমাদের জান-মাল ও স্ত্রী-সন্তানদের হেফাযত করে থাক, অনুরূপভাবে আমাকে হেফাযত করবে। বিনিময়ে তোমাদের জান্নাত লাভ হবে’।[4] এর সাথে সামঞ্জস্যশীল ইবনু ইসহাক্ব কর্তৃক ‘উবাদাহ বিন ছামিত (রাঃ) হ’তে বর্ণিত হাদীছে আরেকটি ধারা উল্লেখিত হয়েছে যে, ‘আমরা নেতৃত্বের জন্য ঝগড়া করব না’।[5] এভাবেই বায়‘আত সমাপ্ত হয়।

অতঃপর রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) উক্ত ৭৫ জনকে ১২ জন নেতার অধীনে ন্যস্ত করেন। যার মধ্যে ৯ জন ছিলেন খাযরাজ গোত্রের ও ৩ জন ছিলেন আউস গোত্রের। ঐ ১২ জন ‘নাক্বীব’ বা নেতার মধ্যে ‘খাযরাজ’ গোত্রের ৯ জন হ’লেন : (১) আস‘আদ বিন যুরারাহ (২) সা‘দ বিন রাবী‘ (৩) আবদুল্লাহ বিন রাওয়াহাহ (৪) রাফে‘ বিন মালেক (৫) বারা বিন মা‘রূর (৬) আবদুল্লাহ বিন ‘আমর বিন হারাম, খ্যাতনামা ছাহাবী জাবের (রাঃ)-এর পিতা (৭) ‘উবাদাহ বিন ছামিত (৮) সা‘দ বিন ‘উবাদাহ (৯) মুনযির বিন ‘আমর। আউস গোত্রের তিন জন হ’লেন : (১) উসায়েদ বিন হুযায়ের (২) সা‘দ বিন খায়ছামাহ (৩) রেফা‘আহ বিন আবদুল মুনযির।[6] অতঃপর নেতা ও দায়িত্বশীল হিসাবে তাদের নিকট থেকে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) পুনরায় অঙ্গীকার (مِيْثَاقٌ) নেন ও বলেন যে, أَنْتُمْ عَلَى قَوْمِكُمْ بِمَا فِيْهِمْ كُفَلاَءُ كَكَفَالَةِ الْحَوَارِيِّيْنَ لِعِيْسَى ابْنِ مَرْيَمَ، وَأَنَا كَفِيْلٌ عَلَى قَوْمِىْ يَعْنِى الْمُسْلِمِيْنَ ‘তোমরা তোমাদের কওমের উপরে দায়িত্বশীল, যেমন হাওয়ারীগণ ঈসা ইবনে মারিয়ামের পক্ষ থেকে দায়িত্বশীল ছিলেন এবং আমি আমার কওমের উপরে (অর্থাৎ মুসলমানদের উপরে) দায়িত্বশীল’।[7]

এভাবে বিশ্ব ইতিহাসে ইসলামী সমাজ বিপ্লবের সূচনা হয় ইমারত ও বায়‘আতের মাধ্যমে। এর ফলাফল সবারই জানা আছে। এই বায়‘আত ‘দ্বিতীয় আক্বাবার বায়‘আত’ বা ‘বায়‘আতে কুবরা’ (বৃহত্তম বায়‘আত) নামে খ্যাত। নিঃসন্দেহে এই বায়‘আতের মূল শিকড় প্রোথিত ছিল ঈমানের উপরে। যে ঈমান কোন দুনিয়াবী প্রলোভন, লোভ-লালসা ও ভয়-ভীতির কাছে মাথা নত করে না। যে ঈমানের সুবাতাস সমাজে প্রবাহিত হ’লে মানুষের আক্বীদা ও আমলে সূচিত হয় বৈপ্লবিক পরিবর্তন। যে ঈমানের বলেই মুসলমানগণ যুগে যুগে ইতিহাসের পৃষ্ঠায় নিজেদের শ্রেষ্ঠত্বের আসন অলংকৃত করতে সক্ষম হয়েছে। আজও তা মোটেই অসম্ভব নয়, যদি সেই ঈমান ফিরিয়ে আনা যায়।



[1]. মির‘আতুল মাফাতীহ, হা/১৮-এর ব্যাখ্যা ১/৭৫ পৃঃ।

[2]. আর-রাহীকুল মাখতূম পৃঃ ১৪৩; তাফসীরে ইবনে কাছীর ৪/৩৭৮ পৃঃ।

[3]. আর-রাহীকুল মাখতূম পৃঃ ১৫০-১৫১।

[4]. আহমাদ ‘হাসান’ সনদে এটি বর্ণনা করেছেন এবং হাকেম ও ইবনু হিববান একে ‘ছহীহ’ বলেছেন।

[5]. আর-রাহীকুল মাখতূম, পৃঃ ১৪৯ টীকা-১।

[6]. ইবনুল ক্বাইয়িম, যাদুল মা‘আদ ১/৪৩।

[7]. আর-রাহীক্ব পৃঃ ১৫২।