ইহসান ইলাহী যহীর

গ্রন্থাবলী

আল্লামা ইহসান ইলাহী যহীর মাত্র ৪২ বছর এ পৃথিবীর ক্ষণিকের নীড়ে বেঁচেছিলেন। কিন্তু সময়ের সদ্ব্যবহারের কারণে নানাবিধ ব্যস্ততা সত্ত্বেও এত অল্প সময়ে তিনি গবেষণার ক্ষেত্রে অনন্য কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখে গেছেন। শায়খ মুহাম্মাদ নাছের আল-উবূদী যথার্থই বলেছেন, ولقد أنةج في سنواة قليلة مالم ينةجه غيره في سنواة كثيرة. ‘তিনি অল্প কয়েক বছরে যা রচনা করেছেন, অনেক বছরেও তা অন্যরা করতে পারেনি’।[1] তিনি সর্বমোট ১৮টি গ্রন্থ প্রণয়ন করেছেন। তন্মধ্যে ১৪টি আরবী ভাষায় ও ৪টি উর্দূ ভাষায়।[2]

১. আল-কাদিয়ানিয়াহ দিরাসাহ ওয়া তাহলীল (القاديانية دراسات وتحليل) : মদীনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে দামেশকের ‘হাযারাতুল ইসলাম’ পত্রিকায় প্রকাশিত ১০টি প্রবন্ধের সমাহার এ গ্রন্থটি। আল্লামা যহীর বলেন, تركت المقالات كلها على حالها كما كتبت ولم أغير فيها ولم أبدل، فلذلك يرى القارئ المقدمات البسيطة قبل كل مقال للدخول في أصل الموضوع. ‘প্রবন্ধগুলো যেভাবে লিখেছিলাম সেভাবেই সেগুলোকে রেখে দিয়েছি। তাতে কোন পরিবর্তন-পরিবর্ধন করিনি। তাই মূল বিষয়ে প্রবেশের জন্য পাঠক প্রত্যেকটি প্রবন্ধের শুরুতে সামান্য বিস্তৃত লক্ষ্য করবেন’।[3] ১ম প্রবন্ধে কাদিয়ানীদের উত্থানে সাম্রাজ্যবাদী ইংরেজদের ভূমিকা। ২য় প্রবন্ধে মুসলমানদের সম্পর্কে কাদিয়ানীদের আক্বীদা, ইসরাঈল কর্তৃক কাদিয়ানীদের সহযোগিতা এবং ইসরাঈলে কাদিয়ানী কেন্দ্র সম্পর্কে। ৩য় প্রবন্ধে বিভিন্ন নবী ও ছাহাবীগণ সম্পর্কে তাদের দৃষ্টিভঙ্গি। ৪র্থ প্রবন্ধে গোলাম আহমাদ কাদিয়ানীর রাসূল (ছাঃ)-এর চেয়ে শ্রেষ্ঠত্ব দাবী ও তার অসারতা। ৫ম প্রবন্ধে আল্লাহ, খতমে নবুঅত, জিবরীল, কুরআন, হজ্জ, জিহাদ প্রভৃতি সম্পর্কে তাদের আক্বীদা। ৬ষ্ঠ প্রবন্ধে গোলাম আহমাদ কাদিয়ানীর জীবনী। ৭ম প্রবন্ধে তার ভবিষ্যদ্বাণী সমূহ। ৮ম প্রবন্ধে ঈসা (আঃ) সম্পর্কে তাদের আক্বীদা, ৯ম প্রবন্ধে কাদিয়ানীদের নেতা ও তাদের বিভিন্ন গোষ্ঠী সম্পর্কে এবং ১০ম প্রবন্ধে খতমে নবুঅত সম্পর্কে তাদের আক্বীদা বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছে। এ পর্যন্ত আরবীতে এটির ৩০টি ও ইংরেজীতে ২০টি সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছে।

২. আশ-শী‘আ ওয়াস সুন্নাহ (الشيعة والسنة) : তিন অধ্যায়ে বিন্যস্ত এ গ্রন্থটি প্রথম ১৯৭৩ সালে প্রকাশিত হয়। ১৯৮৪ সালে এটির ২৪তম সংস্করণ প্রকাশিত হয়। এ পর্যন্ত এটির ৩৩তম সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছে। প্রথম অধ্যায়ে আব্দুল্লাহ বিন সাবার ফিতনা, খুলাফায়ে রাশেদীন, উম্মাহাতুল মুমিনীন সহ অন্যান্য ছাহাবীগণ সম্পর্কে শী‘আদের ভ্রান্ত ধারণা, অপবাদ, তাদেরকে কাফের আখ্যাদান প্রভৃতি বিষয় আলোচিত হয়েছে। দ্বিতীয় অধ্যায়ে শী‘আদের কুরআন পরিবর্তন ও ইমামতের গুরুত্ব এবং তৃতীয় অধ্যায়ে তাদের ভ্রান্ত ‘তাক্বিয়া’ নীতি সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে।

ইংরেজী, ফার্সী, তুর্কী, তামিল, ইন্দোনেশীয়, থাইল্যান্ডী, মালয়েশীয় প্রভৃতি ভাষায় এটির অনুবাদ প্রকাশিত হয়েছে। আরবী ভাষায় এর প্রকাশ সংখ্যা ১০ লাখ কপিতে গিয়ে ঠেকেছে। গ্রন্থটির ভূয়সী প্রশংসা করে মুহাম্মাদ বিন ইবরাহীম আশ-শায়বানী বলেন, وللمرة الأولى في ةاريخ الةأليف في الملل والنحل يؤلف كةاب بهذا الةفصيل الذي لم يسبق إليه. لا نظير له في المؤلفاة الحديثة. ‘ধর্মতাত্ত্বিক গোষ্ঠী সম্পর্কে গ্রন্থ রচনার ইতিহাসে প্রথমবারের মতো এ ধরনের বিস্তারিত বিবরণ সম্বলিত অভূতপূর্ব গ্রন্থ লেখা হয়। আধুনিক রচনাবলীতে এর নযীর নেই’।[4]

৩. আশ-শী‘আ ওয়া আহলুল বায়েত (الشيعت وأهل البيت) : এ গ্রন্থে শী‘আদের আহলে বায়তের প্রতি মেকি ভালবাসার মুখোশ উন্মোচন করা হয়েছে। যেমন গ্রন্থটির ভূমিকায় আল্লামা যহীর বলেন,

فأولا وأصلا كتبنا هذا الكتاب لأولئك المخدوعين المغترين، الغير العارفين حقيقة القوم وأصل معتقداتهم كى يدركوا الحق، ويرجعوا إلى الصواب إن وفقهم الله لذلك، ويعرفوا أن أهل البيت- نعم- وحتى أهل بيت علي رضى الله عنهم أجمعين لا يوافقون القوم ولا يقولون بمقالتهم، بل هم على طرف والقوم على طرف آخر، وكل ذلك من كتب القوم وبعباراتهم هم أنفسهم.

‘যারা শী‘আদের প্রকৃতি ও তাদের মৌলিক বিশ্বাস সমূহ সম্পর্কে অনবহিত সে সকল প্রতারিত ব্যক্তিদের জন্যই আমরা মূলত এই বইটি লিখেছি। যাতে তারা যেন প্রকৃত বিষয়টি জানতে পারে এবং যদি আল্লাহ তাদের তাওফীক দেন তাহলে যেন তারা সত্যের দিকে ফিরে আসে। আর তারা এটাও জানতে পারে যে, আহলে বায়েত এমনকি খোদ আলী (রাঃ)-এর পরিবার-পরিজনও শী‘আ জাতির সাথে একমত নয় এবং তারা যা বলে তারা তা বলে না। বরং তারা একপ্রান্তে আর শী‘আরা আরেক প্রান্তে। এ সকল কিছু শী‘আদের বইপত্র ও তাদের উদ্ধৃতি দিয়েই উল্লেখ করা হয়েছে’।[5]

চারটি অধ্যায়ে বিভক্ত এ গ্রন্থের মোট পৃষ্ঠা সংখ্যা ৩১৬। প্রথম অধ্যায়ে শী‘আ ও আহলে বায়েত শব্দের বিশ্লেষণ এবং ইমামদের ব্যাপারে তাদের বাড়াবাড়ি সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। দ্বিতীয় অধ্যায়ে কুরআন মাজীদে ছাহাবীগণের প্রশংসা, ছাহাবীগণ সম্পর্কে আলী (রাঃ)-এর দৃষ্টিভঙ্গি, খুলাফায়ে রাশেদীন সম্পর্কে শী‘আদের দৃষ্টিভঙ্গি প্রভৃতি বিষয় আলোচনা করা হয়েছে। তৃতীয় অধ্যায়ে মুত‘আ বিবাহ সম্পর্কে এবং চতুর্থ অধ্যায়ে রাসূল (ছাঃ), তাঁর সন্তান-সন্ততি ও ছাহাবীগণ সম্পর্কে তাদের বাজে মন্তব্য সমূহ পর্যালোচনা করা হয়েছে। উর্দূ, ইংরেজী, তুর্কী প্রভৃতি ভাষায় এটির অনুবাদ প্রকাশিত হয়েছে। শায়বানী এ গ্রন্থটি সম্পর্কে বলেছেন, فمن كان في بيةه هذا الكةاب فقد عرف حقيقة ادعائهم حب آل بية النبي صلى الله عليه وسلم الذي هو في الحقيقة طعن لهم وإهانة. ‘যার গৃহে এই বইটি থাকবে সে নবী (ছাঃ)-এর পরিবারকে তাদের ভালবাসার দাবির প্রকৃতি সম্পর্কে জানতে পারবে। যা আসলে আহলে বায়তের প্রতি অপবাদ ও লাঞ্ছনার শামিল’।[6]

৪. আশ-শী‘আ ওয়াল কুরআন (الشيعة والقرآن) : আল্লামা মুহিববুদ্দীন আল-খতীব মিসরী (১৩০৩-১৩৮৯ হিঃ) الخطوط العريضة নামে শী‘আদের বিরুদ্ধে একটি বই লিখেন। এ বইয়ে তিনি প্রমাণ করেন যে, শী‘আরা কুরআন পরিবর্তন করেছে। এর জবাবে একজন শী‘আ আলেম مع الخطيب فى خطوطه العريضة নামে একটি বই লিখে দাবী করেন যে, আহলে  সুন্নাত ওয়াল জামা‘আতের নিকট কুরআন যেমন অবিকৃত, তেমনি শী‘আদের নিকটও। আল্লামা যহীর সেই শী‘আ আলেমের দাবীর অসারতা ও খতীবের বক্তব্যের যথার্থতা প্রমাণ করে ৩৫২ পৃষ্ঠা সম্বলিত উক্ত বইটি রচনা করেন। যেমন তিনি বলেছেন, وأثبةنا فيه صدق ما قاله الخطيب لا بالكلام والعواطف، بل بالأدلة القاطعة، والبراهين الساطعة، والنصوص الثابةة، والعباراة الصريحة، والرواياة الجلية والقطعية حيث الثبوة والنسبة. ‘আমরা এতে খতীবের বক্তব্যের সত্যতা প্রমাণ করেছি কথা ও আবেগের বশবর্তী হয়ে নয়; বরং অকাট্য দলীল-প্রমাণ, প্রমাণিত নছ, সুস্পষ্ট উদ্ধৃতি এবং অকাট্য বর্ণনা সমূহ দ্বারা’।[7] পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষায় এটি অনূদিত ও একাধিকবার প্রকাশিত হয়েছে।

৫. আল-ব্রেলভিয়া আক্বাইদ ওয়া তারীখ (البريلوية عقائد وتاريخ) : ভারতীয় উপমহাদেশের বিদ‘আতী ও কবরপূজারী ব্রেলভী ফিরক্বা সম্পর্কে এটি একটি প্রামাণ্য গ্রন্থ। এ গ্রন্থের সুবাদে আরব বিশ্বের জনগণ প্রথমবারের মতো এই ভ্রান্ত ফিরক্বা সম্পর্কে অবগত হয়। পাঁচটি অধ্যায় সম্বলিত এ গ্রন্থের মোট পৃষ্ঠা সংখ্যা ২৫৪। প্রথম অধ্যায়ে এ মতবাদের ইতিহাস ও এর প্রতিষ্ঠাতা আহমাদ রেযা খানের জীবনী, দ্বিতীয় অধ্যায়ে ব্রেলভীদের আক্বীদা-বিশ্বাস, তৃতীয় অধ্যায়ে তাদের শিক্ষা, চতুর্থ অধ্যায়ে মুসলমানদের মধ্যে যারা তাদের আক্বীদা বিরোধী তাদেরকে কাফের আখ্যাদান ও তাদের বিভিন্ন বিদ‘আতী আমল এবং পঞ্চম অধ্যায়ে তাদের বিভিন্ন আজগুবি কেচ্ছা-কাহিনী আলোচনা করা হয়েছে।

এছাড়া তাঁর রচিত অন্য গ্রন্থগুলি হচ্ছে-

৬. আশ-শী‘আ ওয়াত তাশাইয়ু‘ (الشيعة والتشيع) ৭. আল-ইসমাঈলিয়াহ : তারীখ ওয়া আক্বাইদ (الإسماعيلية تاريخ وعقائد) ৮. আল-বাবিয়া আরয ওয়া নাক্বদ (البابية عرض ونقد) ৯. আল-বাহাইয়া : নাক্বদ ওয়া তাহলীল (البهائية نقد وتحليل) ১০. আর-রাদ্দুল কাফী আলা মুগালাতাতিদ দুকতূর আলী আব্দুল ওয়াহিদ ওয়াফী ফী কিতাবিহি বায়নাশ শী‘আ ওয়া আহলিস সুন্নাহ ১১. দিরাসাত ফিত-তাছাউওফ (دراسات في التصوف) ১২. ‘সুকূতে ঢাকা’ (ঢাকার পতন) (উর্দূ) ১৩. আত-তুরুকুল মাশহূরাহ ফী শিবহিল কার্রাহ আল-হিন্দিয়া (অপ্রকাশিত) (الطرق المشهورة في شبه القارة الهندية) ১৪. আত-তাছাউওফ  আল-মানশাউ ওয়াল মাছাদির (التصوف المنشأ والمصادر) ১৫. কুফর ওয়া ইসলাম (উর্দূ) ১৬. ইমাম ইবনু তায়মিয়ার ‘কিতাবুল অসীলা’-এর উর্দূ অনুবাদ ১৭. সফরে হিজায (উর্দূ) ১৮. আন-নাছরানিয়াহ (অপ্রকাশিত)।



[1]. ড. যাহরানী, প্রাগুক্ত, পৃঃ ১২৯।

[2]. ঐ, পৃঃ ১৩৪-৩৫।

[3]. আল-কাদিয়ানিয়াহ পৃঃ ১৩।

[4]. শায়বানী, ইহসান ইলাহী যহীর, পৃঃ ৫।

[5]. আশ-শী‘আ ওয়া আহলুল বায়েত, পৃঃ ৮।

[6]. শায়বানী, ইহসান ইলাহী যহীর, পৃঃ ৬।

[7]. আশ-শী‘আ ওয়াল কুরআন, পৃঃ ৭